স্থায়ী বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠিত হলে সরকারি অথবা বেসরকারি, যেকোনো প্রতিষ্ঠানেই কর্মরত ব্যক্তি সেই কর্ম প্রতিষ্ঠানকে নিজের বলেই ভাবতে পারবে। তখন সে নিজেকে সেই প্রতিষ্ঠানের শুধুমাত্র একজন বেতনভুক কর্মচারী বলে ভাববে না। সে সত্যি সত্যিই নিজেকে ঐ প্রতিষ্ঠানের অংশ বলে মনে করবে। আন্তরিকতার সঙ্গে ওই ব্যক্তি যখন পরিশ্রম করবে, তখন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনেক বেশি মুনাফা হবে। অনেক বেশি লাভবান হবে ওই প্রতিষ্ঠান আর ঐ প্রতিষ্ঠান থেকে সরকার যে অর্থ পায় কর হিসাবে, সেই প্রাপ্য কর পাবে সরকার। এর ফলে সরকারি কোষাগার সমৃদ্ধ হবে। যে সমস্ত সরকারি উদ্যোগের দ্বারা সাধারণ মানুষ উপকৃত হচ্ছে বা হবে, সেই সমস্ত উদ্যোগকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কখনো অর্থের অভাব হবে না। আমরা জানি ভূপৃষ্ঠে জলস্তর ভয়ংকরভাবে নেমে যাচ্ছে। এর ফলে চরম জল কষ্টের কথা আমরা সকলেই জানি এবং প্রায় সকলেই এই ব্যাপারে কমবেশি ভুক্তভোগী। সরকারি কোষাগারে যদি যথেষ্ট অর্থ থাকে তাহলে এই সমস্যা সমাধানের জন্য সমুদ্রের, নদীর বা অন্যান্য জলাশয়ের জল রিফাইন করার উদ্যোগ নিতে পারে। পাইপলাইনের সাহায্যে জ্বালানি তেল সংগ্রহ ও সরবরাহের উদ্যোগ যেমন সরকার নিয়ে থাকে, তেমনি ভাবেই চরম জল সংকট মেটানোর উদ্যোগ নিতে পারে আর এর জন্য যে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন, সরকারের হাতে প্রচুর অর্থ থাকবে স্থায়ী বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার ফলে, মানুষের মনের পরিবর্তন হবে এবং মানুষ সুন্দর ভাবে সেই কাজটুকু সম্পাদন করবে! এর ফলে ব্যক্তিগতভাবেও মানুষ উপকৃত হবে কারণ কোন প্রতিষ্ঠানের যখন আর্থিক মুনাফা হবে, তখন সেই প্রতিষ্ঠান কর্মরত মানুষকে, উক্ত প্রতিষ্ঠান তা সরকারি বা বেসরকারি যাই হোক না কেন বোনাস, ইন্সেন্টিভ ইত্যাদি নানাভাবে আরও নগদ অর্থের দ্বারা তাদের কর্মচারীদের খুশি করবে। বেশি নগদ অর্থ পেয়ে কর্মচারীরা উপকৃত হবে আরো বেশি। সর্বাঙ্গসুন্দর হবে দেশের অর্থনীতি।
যে কোন দেশে, যে কোনো উৎসবে, তা সে যে দেশই হোক না কেন বা সেই উৎসবের প্রকৃতি যাই হোক,একটা কমন ফ্যাক্টর সেখানে থাকে। তা হল বাজি পোড়ানো। হাজার হাজার কোটি কোটি টাকা স্রেফ ধোঁয়া হয়ে বাতাসে, পরিবেশে মিশে যায়। অথচ সেই বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়ে আহার, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যের মত অত্যাবশ্যকীয় খাতে আরও অনেক বেশি অর্থ ব্যবহৃত হতে পারতো।
এ তো গেল এক দিকের কথা। অন্যদিকে নিঃশব্দে অথচ বিপুল গতিতে আমরা একেবারে অতি সক্রিয়ভাবে আমাদের এই সুন্দরী, স্নেহময়ী পৃথিবীকে এক অতি ভয়াবহ গ্যাস চেম্বারে পরিণত করে ফেলছি। আমাদের ইতিহাস বইতে যে গ্যাস চেম্বারের কথা পড়ে শিউরে উঠি, তার সাথে এর পার্থক্য হল আমরা যারা আজকের পৃথিবীতে বর্তমান তারা তো সমূলে ধ্বংস হবোই, আমাদের সেই নিদারুণ করুণ কাহিনী শুনে বা পড়ে শিউরে ওঠার মত পরবর্তী প্রজন্ম বলে পৃথিবীতে আসার সুযোগ পাবে না।
স্থায়ী বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠিত হলে মানুষের মনে যখন এই ভয়াবহতা সম্পর্কে চেতনা জাগ্রত হবে, মানুষ নিজের এবং আগামী প্রজন্মের সুরক্ষা সম্পর্কে সচেতন হবে এবং বাজি পোড়ানোর মত ভয়াবহ উৎসব চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে ।
যে সমস্ত মানুষের জীবনের আদর্শ হলো চারপাশের মানুষকে নতুন কিছু দেওয়া যাতে তাদের ভাবনা বা কাজ মানুষের পক্ষে কল্যাণকর হবে, তারাও অনেক সচ্ছন্দে কাজ করতে পারবে। কারণ স্থায়ী বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা হলে মানুষ সহজেই তাদের ভালো ভাবনার কাজকে অন্তর থেকে গ্রহণ করতে পারবে এবং স্বাগত জানাবে।
স্থায়ী বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠিত হলে মানুষের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা অতি উল্লেখযোগ্য কমে যাবে কারণ মানুষ নিজেই উপলব্ধি করবে, চুরি, ছিনতাই, খুন, রাহাজানি করে শুধুমাত্র ঘৃণা আর অপরাধের তকমা ছাড়া আর কিছুই জুটবে না। ঠাঁই হবে জেলে বা কথা একটু সংশোধন করে নিয়ে সংশোধনাগারে। শুধু নিজের নয়, তার সঙ্গে সম্পর্কিত মানুষদের জীবনেও নেমে আসে অন্ধকার। সমাজের চোখে হয়ে যায় ঘৃণা আর উপহাসের পাত্র। কিন্তু মান সম্মানে আর পরের অনেক উপকারের ফলে সাহায্য পাওয়া যায় চারপাশের মানুষের কাছ থেকে। অপরাধপ্রবণতা মানুষের মন থেকে ধীরে ধীরে মুছে যাবে। মানুষের ভালোবাসায় ভরা, ভালোবাসার কারাগারে অতি আনন্দের সঙ্গে প্রবেশ করবে আর কখনোই সেখান থেকে মুক্তি পেতে চাইবে না।
সন্ত্রাস সারা পৃথিবীতে নেমে এসেছে যেন প্রতিহিংসার এক সুবিশাল কালো ঈগলের ডানায় ভর করে। তার বিপুল শক্তিশালী ডানার ঝাপটায় বারবার রক্তাক্ত হচ্ছে মানব সভ্যতার ইতিহাস। মাটি রক্তাক্ত হচ্ছে অতর্কিত আক্রমণে। চারপাশে, সারা বিশ্বজুড়ে মানুষের আকুতি আকাশে, বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে এই সন্ত্রাসের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য; কিন্তু শুধু প্রার্থনায় এই সন্ত্রাস মুছে যেতে পারেনা। সন্ত্রাসী বাঁ সন্ত্রাসবাদ বাইরের কোন গ্রহ থেকে আসেনি। এই পৃথিবীর মাটিতে, এই পৃথিবীরই এক মাতৃগর্ভে জন্ম আজকের এই ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসীর। ফাঁসি বা গুলিতে ঝাঁঝরা করে নয়, পরিবর্তন ঘটাতে হবে তার মানসিকতায়। তাকে বোঝাতে হবে ছোটবেলায় সে যেমন গল্প শুনতে শুনতে মায়ের কোলে ঘুমিয়ে পড়তো, সবুজ মাঠে সে যেমন পরম আনন্দে বন্ধুদের সাথে খেলা করে বেড়াতো, ঠিক তেমনিই মায়ের কোলে বসে গল্প শোনার বা নির্ভয়ে খেলে বেড়ানোর অধিকার আছে পৃথিবীর সব শিশুরই। স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার অধিকার আছে প্রত্যেক মানুষেরই। ঘৃণায় নয়, ভয়ে নয়, ভালোবাসায় বশ হবে সব মানুষ- একমাত্র এই উপলব্ধিই, মানুষের মন থেকে উপড়ে ফেলবে ঘৃণা।
অসময়ে প্রকৃতিই আমাদের আশ্রয় দেয়। রক্ষা করে। মানুষকে এলাকাচ্যুত এমনকি দেশচ্যুতও হতে বাধ্য করা যেতে পারে, কিন্তু প্রকৃতি তাকে কখনোই আশ্রয়চ্যুত করে না। প্রকৃতিকে ধ্বংসের যত চেষ্টাই মানুষ করুক না কেন, পৃথিবীর পরম আশীর্বাদের এই প্রকৃতি খুব সহজেই সমস্ত বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠে একেবারে নিজে নিজেই। মানুষের কোনো সাহায্যের প্রয়োজন তার হয় না। এই কথাটা আমরা যত তাড়াতাড়ি বুঝবো, ততই আমরা প্রকৃতিকে ধ্বংস করার চেষ্টা থেকে বিরত থাকব। স্থায়ী বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা হলে, পৃথিবীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অক্ষুন্ন থাকবে, আমাদের চারপাশ পরিচ্ছন্ন থাকবে, সুন্দর ও নীরোগ থাকার পথ আমাদের কাছে খুবই সুগম হয়ে যাবে।