।। চতুর্দশ অধ্যায়।।

আমরা প্রাথমিকভাবে গ্রীন-হাউস গ্যাস বলতে যা বুঝি, সেগুলো হলো জলীয় বাষ্প, কার্বন-ডাই-অক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড এবং ওজোন গ্যাসকে। এই গ্যাসগুলি একটি গ্রীন হাউসের ছাদের মত কাজ করে। ঠিক যেমন কোন গ্রীনহাউসের কাচের ছাদ সূর্যের আলো শুষে নেয়, তেমনিভাবেই এই গ্যাসেরাও শুষে নেয় সুর্যের প্রচণ্ড তাপের অধিকাংশটুকুই এবং সামান্য অংশই ফিরিয়ে দেয় বায়ুমন্ডলে। এর ফলেই একটানা এইভাবে চলতে থাকায় এই পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠ ও বায়ুমণ্ডল ভয়ংকরভাবে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সারা বিশ্বের বিজ্ঞানীরা আজ একমত যে আজকের এই ভয়ঙ্কর উষ্ণায়নের জন্য দায়ী আমাদের অপরিণামদর্শী হঠকারী এবং আত্মঘাতী কার্যকলাপ। বাতাসে কার্বনের মাত্রা মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে আমাদের বিভিন্ন আত্ম-ধ্বংসাত্মক মনোভাব আর এই উষ্ণতা বেড়েছে যে যে কাজগুলোয় সেগুলো হলো কয়লা পোড়ানো, বন জঙ্গল কেটে সাফ করে এমনভাবে পরিবেশে সেই গ্যাস ছড়িয়ে দিয়েছি, সেই গ্যাস ওয়ার্ম ট্র্যাপ হিসেবে কাজ করে। সেই কারণেই বিজ্ঞানীরা এক বাক্যে বলেছেন, গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বিশ্ব-উষ্ণায়নের জন্য মানুষই দায়ী। বিজ্ঞানীরা পঞ্চাশ বছরের গবেষণায় উনিশশো ষাট সালে ঘোষণা করেন ধূমপানই ক্যান্সারের অন্যতম প্রধান কারণ। এই বিষয়ে অত্যন্ত নিবিড় ও সুদীর্ঘ দিন প্রচারের ফলে আজ আমরা এই বিষয়ে সচেতন কতদূর বলা মুশকিল, তবে এই কথাটা আমরা সবাই আজ কমবেশি জানি। আর বিজ্ঞানীরা বলেছেন, ক্যান্সার আর ধূমপানের যে ভয়াবহ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, আমাদের এই মারাত্মক কাজের সঙ্গে গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর সম্পর্কও ঠিক তাই! এই গ্লোবাল ওয়ার্মিং যা চরম দূষণ ও উষ্ণতা বাড়িয়ে ইকোলজিক্যাল ব্যালেন্স- কে চরম সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে, তা  একমাত্র কমতে পারে, এখনই যদি আমরা এই বিষয়ে সচেতন হই, এই পৃথিবীকে দূষণমুক্ত করার জন্য আমরা যথাযথ ভাবে প্রত্যেকটি মানুষ যদি আমাদের দায়িত্ব পালন করি, দূষণমুক্ত রাখার জন্য আমাদের যা যা করা উচিত, যা এর আগে বেশ কয়েকবারই আলোচনা করেছি, সঠিকভাবে যদি তাই তাই করতে পারি, তাহলে গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বিশ্ব উষ্ণায়নের চরম অভিশাপ থেকে মুক্তি পাব আমরা। তা না হলে একদিন এই বিশাল পৃথিবীই একটা গ্যাস চেম্বার এ পরিণত হবে। তখন কিন্তু আর, এটা ও দেশের সমস্যা, এদেশের নয় বা ঐ ব্যাপারটা ওদের, আমাদের নয়, আমরা এখানে সেফ্ আছি, একথা বলে কেউ কোথাও বসে পার পাবোনা! পৃথিবী সত্যিই তখন বাসের অযোগ্য হয়ে উঠবে। মৃত্যুপুরীতে পরিণত হবে। তা কিন্তু তার ইচ্ছেতে নয়। আমাদের আত্মঘাতী ইচ্ছেতে। আত্মঘাতী সংগঠনের সদস্যদের অতর্কিত হামলায় ক্ষয়ক্ষতি হয় অনেক, প্রাণহানিও হয় বেশকিছু। আমাদের অপরিণামদর্শী কাজের জন্য কিন্তু কয়েকজন বা কয়েকশো জন, এই পৃথিবীর যত মানুষ, তাদের সংখ্যা যত কোটিই হোক না কেন, ধীরে ধীরে কিন্তু অমোঘ আর নিশ্চিতভাবেই চলেছি এক মৃত্যু উপত্যকা দিয়ে এক চরম পরিনতির দিকে। আমরাই পারি আমাদেরকে এই বিপদ থেকে বাঁচাতে, আমাদের চেতনা আর উপলব্ধির দ্বারা।এই চেতনায় উদ্ভুদ্ধ হতে হবে আমাদের সবাইকে।এককভাবে প্রত্যেককে দায়িত্ব নিতে হবে এই কাজের কারণ আমরা জানি পাঁচজন আলাদা মানুষকে নিয়েই গঠিত পঞ্চজনের একটি দল। বিন্দু বিন্দু জল মিলিত হয়ে যে সিন্ধু হয়, তা তো অতি পুরানো উদাহরণ। যে কোন অতি বৃহৎ কাজের সূত্রপাত হয় অতি ক্ষুদ্রভাবেই।অতি বৃহৎ ও অসংখ্য অতি ক্ষুদ্রের সমষ্টি ছাড়া আর কিছু না।

স্থায়ী বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার দিকে আমরা যত এগিয়ে যাব, ততোই বিশ্বরাজনীতির শুদ্ধিকরণ হতে থাকবে কারণ তখন যুদ্ধের দ্বারা বা কূটনীতির মাধ্যমে আর হুমকি দিয়ে, কয়েকটি দেশ মিলে প্রেসার পলিটিক্স বা চাপের রাজনীতির মাধ্যমে একটি দেশকে নতি স্বীকার করতে বাধ্য করা- এইসব তখন ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ তখন প্রত্যেকের লক্ষ্য থাকবে নিজের নিজের দেশকে বিজ্ঞান, শিল্প,সাহিত্য ও অর্থনীতিতে উচ্চতর জায়গায়  নিয়ে যাওয়া আর দেশের প্রত্যেকটি মানুষকে একটা বিশুদ্ধ, নির্মল পরিবেশযুক্ত পৃথিবী উপহার দেওয়া আর বিশ্বব্যাপী শান্তির বাতাবরণ তৈরি ও দূষণমুক্ত পৃথিবী গড়ার জন্য ইউনাইটেড নেশনস অর্গানাইজেশন- এর প্রচার ও প্রচেষ্টাকে সার্থক, ও সর্বাত্মক রূপ দেবে স্থায়ী বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ও কার্যকারিতা।